





























Hadeeth Cards
Da'wa cards that highlight great meanings from the noble prophetic hadiths in a simple style and attractive display that helps the Muslim to have a deeper understanding of his religion in an easy way
All
আবদুল্লাহ বিন ’আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছেনঃ “তোমরা যখন মুওয়াযযিনকে আযান দিতে শুন, তখন সে যা বলে তোমরা তাই বল। অতঃপর আমার ওপর দুরূদ পাঠ কর। কেননা, যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরূদ পাঠ করে আল্লাহ তা’আলা এর বিনিময়ে তার উপর দশবার রহমত বর্ষণ করেন। অতঃপর আমার জন্যে আল্লাহর কাছে ওসীলাহ প্রার্থনা কর। কেননা, ওসীলাহ জান্নাতের একটি সম্মানজনক স্থান। এটা আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে একজনকেই দেয়া হবে। আমি আশা করি, আমিই হব সে বান্দা। যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে আমার জন্যে ওসীলাহ প্রার্থনা করবে তার জন্যে (আমার) শাফাআত অর্জন হয়ে যাবে”।
ইমাম মুসলিম এটি বর্ণনা করেছেনযে ব্যক্তি মুয়াযযিনকে সালাতের আযান দিতে শুনবে, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে মুয়াযযিনের পরে উত্তর দিতে নির্দেশ দিয়েছেন। সে মুয়াযযিনের কথার মতই বলবে। তবে দু’টি হায়আলাহ.. ব্যতিরেকে, কারণ তার পরে لا حول ولا قوة إلا بالله [লা হাওলা ওয়ালা কুওওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ] বলবে। তারপর আযান শেষ হলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর সালাত (দরূদ) পেশ করবে। কেননা, যে ব্যক্তি তাঁর ওপর একবার সালাত পেশ করবে আল্লাহ তা’আলা তার কারণে তার উপর দশবার রহমত বর্ষন করেন। বান্দার ওপর আল্লাহর সালাত পেশ করার (অন্য) অর্থ হলো: আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার জন্য ফেরেশ্তাদের সামনে প্রশংসা করা। অতঃপর তিনি আল্লাহর নিকট তাঁর নিজের জন্যে অসীলা প্রার্থনা করার নির্দেশ দিয়েছেন, আর তা হলো জান্নাতে মর্যাদাপূর্ণ একটি বিশেষ স্থান,আর তা হলো সবচেয়ে উঁচু মকাম। আল্লাহর সকল বান্দা থেকে কেবল একজন বান্দার জন্যে সে স্থান অর্জন ও উপযুক্ত হবে। আর সেই একক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাড়া কেউ হবেন না। কারণ, তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ মাখলূক। অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা করেছেন, যে ব্যক্তি তাঁর জন্যে অসীলাহর দোয়া করবে তার সুপারিশ তাঁর জন্যে অর্জন হয়ে যাবে।
উসমান ইবনু আবূল আস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে বর্ণিত, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে বললেন- হে আল্লাহর রসূল ! শয়তান আমার মাঝে , আমার সালাতের মাঝে ও কিরাআতের মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়ায় এবং গোলমাল বাধিয়ে দেয় । তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ “এটা এক (প্রকারের) শয়তান— যার নাম ’খিনযিব’। যে সময় তুমি তার উপস্থিতি বুঝতে পারবে তখন (আউয়ুবিল্লাহ পড়ে) তার অনিষ্ট হতে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চেয়ে তিনবার তোমার বাম পাশে থুথু ফেলবে”। তিনি বলেন, তারপরে আমি তা করলাম আর আল্লাহ আমার হতে তা দূর করে দিলেন।
ইমাম মুসলিম এটি বর্ণনা করেছেনউসমান বিন আবিল ‘আস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে বর্ণিত, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে বললেন- হে আল্লাহর রসূল! শাইতান আমার ও আমার সালাতের মধ্যে বাধা হয়ে দাঁড়ায় এবং আমাকে তার একাগ্রতা থেকে বঞ্চিত করে এবং আমার কিরাতে গোলমাল বাধিয়ে দেয় ও তাতে সন্দেহ সৃষ্টি করে। তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেনঃ এটা এক (প্রকারের) শয়তান— যার নাম ’খিনযিব’। যে সময় তুমি এর উপস্থিতি বুঝতে পারবে ও তাকে অনুধাবন করবে তখন আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করো এবং (আউয়ুবিল্লাহ পড়ে) তার অনিষ্ট হতে আল্লাহর কাছে পানাহ চাও এবং তিনবার তোমার বাম পাশে সামান্য থুথুসহ ফু দাও। উসমান বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে যা করার নির্দেশ দিয়েছেন তাই করলাম, তারপরে আল্লাহ আমার হতে তা দূর করে দিলেন।
আব্বাস ইবনু আবদুল মুত্তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছেন: “সে ব্যক্তি ঈমানের স্বাদ পেয়েছে, যে রব হিসেবে আল্লাহকে, দীন হিসেবে ইসলামকে এবং রাসূল হিসেবে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে সন্তুষ্ট চিত্তে স্বীকার করেছে”।
ইমাম মুসলিম এটি বর্ণনা করেছেনরাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে বলেন, একজন সত্যিকার মুমিন যে তার ঈমানে আন্তরিক এবং যার অন্তর ঈমান দ্বারা প্রশান্ত সে তার হৃদয়ে উন্মুক্ততা, প্রসারতা, আনন্দ, মিষ্টতা এবং আল্লাহ তা‘আলার নৈকট্যের স্বাদ আস্বাদন ও উপলব্ধি করবে, যদি তিনি তিনটি বিষয়ে সন্তুষ্ট হন: প্রথমত: সে রব হিসাবে আল্লাহর প্রতি সন্তষ্ট। আর তা হল রুবুবিয়্যাহর(একমাত্র তিনিই রব এর) দাবি অনুসারে আল্লাহর তরফ থেকে তার ওপর জীবিকার যে বণ্টন ও অবস্থা আপতিত হয় তাতে তার অন্তর সম্পূর্ণ প্রশস্ত থাকবে এবং তার অন্তরে কোন আপত্তি খুজে পাবে না। আর আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন রবকে অন্বেষণ করবে না। দ্বিতীয়ত: তিনি ইসলামকেই দ্বীন হিসেবে পছন্দ করল। আর তা হল ইসলাম যেসব আবশ্যক (ওয়াজিব) ও গুরু দায়িত্ব অন্তর্ভুক্ত করে তার প্রতি তার হৃদয় উন্মুক্ত থাকবে এবং ইসলামের পথ ছাড়া অন্য কিছু সন্ধান করবে না। তৃতীয়ত: তিনি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রাসূল হিসাবে পছন্দ করবেন। আর তা হল তিনি যা কিছু নিয়ে এসেছেন তার প্রতি তাঁর হৃদয় উন্মুক্ত থাকবে এবং বিনা দ্বিধায় বা সন্দেহ ছাড়াই তার প্রতি খুশি প্রকাশ করবে এবং তার আদর্শ ছাড়া কোনো পথ অনুসরণ করবে না।
‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “চারটি স্বভাব যার মধ্যে বিদ্যমান সে হচ্ছে খাঁটি মুনাফিক। যার মধ্যে এর কোন একটি স্বভাব থাকবে, তা পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত তার মধ্যে মুনাফিকের একটি স্বভাব থেকে যায়। আমানত রাখা হলে খিয়ানত করে; কথা বললে মিথ্যা বলে; অঙ্গীকার করলে ভঙ্গ করে; এবং বিবাদে লিপ্ত হলে অশ্লীলভাবে গালাগালি দেয়”।
সহীহ বুখারী ও মুসলিমনবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম চারটি বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সতর্ক করেছেন যেগুলো যদি একজন মুসলিমের মধ্যে একত্রিত হয়, তবে এই বৈশিষ্ট্যগুলির কারণে সে মুনাফিকদের সাথে কঠিন সাদৃশ্যপূর্ণ হবে । আর এটি তার ওপর প্রবল হলে প্রযোজ্য হবে, কিন্তু এটি যার থেকে খুব অল্প সময় প্রকাশ পায় সে এর অন্তর্ভুক্ত নয়, আর তা হল: প্রথমটি: যখন সে কথা বলে তখন তার কথায় ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা ও অসত্য বলে। দ্বিতীয়: যদি সে কোন চুক্তি করে তা পূরণ করে না এবং তার সাথীর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে। তৃতীয়: যখন সে কোন প্রতিশ্রুতি দেয় তা পূরণ করে না এবং তা ভঙ্গ করে। চতুর্থ: যখন কারো সাথে ঝগড়া ও বাদানুবাদ করে তখন তার ঝগড়া তীব্র হয় এবং সে সত্য থেকে বিচ্যুত হয় এবং তাকে প্রত্যাখ্যান ও বাতিল করার ক্ষেত্রে প্রতারণা করে এবং মিথ্যা ও বাতিল বলে। নিফাক হল সে যা গোপন করে তার বিপরীত প্রকাশ করা। এই অর্থ এই গুণাবলী সম্পন্ন ব্যক্তির মধ্যে বিদ্যমান এবং তার নিফাক হয় মানুষদের থেকে যে তার সাথে কথা বলে, তাকে প্রতিশ্রুতি দেয়, তাকে বিশ্বাস করে, তার সাথে ঝগড়া করে এবং তার সাথে চুক্তি করে তার ক্ষেত্রে। এমন নয় যে, সে ইসলামের মুনাফিক, কুফর গোপন করে আর ইসলাম প্রকাশ করে। আর যার মধ্যে এই গুণগুলো হতে একটি গুণ থাকবে; তার ভেতর নিফাকের একটি গুণ থাকবে যতক্ষণ না তিনি তা পরিত্যাগ করেন।
আবূ ওয়াক্বেদ হারেস ইবনে আওফ রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, একদা আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে বসেছিলেন এবং তাঁর সঙ্গে কিছু লোকও ছিল। ইতোমধ্যে তিনজন লোক আগমন করল। তাদের মধ্যে দু’জন আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে উপস্থিত হল এবং একজন চলে গেল। নবাগত দু’জন ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পাশে দাঁড়িয়ে রইল। তাদের একজন সভার মধ্যে ফাঁক দেখে সেখানে বসে পড়ল। আর অপরজন সভার পিছনে বসে গেল। আর তৃতীয় ব্যক্তি পিঠ ঘুরিয়ে প্রস্থান করল। যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবসর পেলেন, তখন বললেন, ‘‘তোমাদেরকে তিন ব্যক্তি সম্পর্কে বলব না কি? তাদের একজন তো আল্লাহর কাছে আশ্রয় গ্রহণ করল, ফলে আল্লাহ তাকে আশ্রয় দান করলেন। আর দ্বিতীয়জন সে [সভার মধ্যে ঢুকে বসতে] লজ্জাবোধ করল, বিধায় আল্লাহও তাঁর ব্যাপারে লজ্জাশীলতা প্রয়োগ [করে তাকে রহম] করলেন। আর তৃতীয়-জন মুখ ফিরিয়ে নিলো, বিধায় আল্লাহও তার দিক থেকে বিমুখ হয়ে গেলেন।’’
মুত্তাফাকুন ‘আলাইহি (বুখারী ও মুসলিম)।এ হাদীসে লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকজন নিয়ে মসজিদে বসেছিলেন। ইতিমধ্যে তিনজন লোক আসলেন। তন্মধ্যে দুজন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে এগিয়ে এলেন এবং একজন চলে গেলেন। তারা দুজন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের হালকায় কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। এরপর তাদের একজন হালকার মধ্যে কিছুটা জায়গা দেখে সেখানে বসে পড়লেন। আর হালকা হলো নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে লোকজনের গোলাকার হয়ে বসা। অন্যজন তাদের পেছনে বসলেন। আর তৃতীয় ব্যক্তি ফিরে গেল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলোচনা শেষে সাহাবীগণকে লক্ষ্য করে বললেন, “আমি কি তোমাদেরকে তিন ব্যক্তি সম্পর্কে সংবাদ দেব? তাদের একজন আল্লাহর দিকে এগিয়ে এসেছে, তাই আল্লাহ তাকে স্থান দিয়েছেন। অর্থাৎ সে আল্লাহর বাণী শুনতে খালি জায়গায় বসেছেন। ফলে এ বরকমতময় মজলিশের ফযীলত দ্বারা আল্লাহ তাকে মর্যাদাবান করেছেন। অন্যজন লজ্জাবোধ করেছেন। তাই আল্লাহও তার থেকে লজ্জাবোধ করেছেন অর্থাৎ সে ভীড় ঠেলে অগ্রসর হতে লজ্জাবোধ করেছেন, তাই সে হালকার পিছনে বসেছেন। ফলে সে মজলিশের বরকত থেকে বঞ্চিত হয় নি। আর অপরজন (মজলিসে হাজির হওয়া থেকে) মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, তাই আল্লাহও তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। অর্থাৎ সে বিনা ওযরে মজলিশে না বসে চলে গেছে, ফলে সে মজলিশের বরকত থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে দু’টি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তার একটি আমি দেখেছি আর অপরটির অপেক্ষা করছি। তিনি আমাদেরকে বলেছেন যে, আমানত মানুষের অন্তরের অন্তঃস্তলে অবতীর্ণ হয়েছে। অতঃপর কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে, ফলে তারা কুরআন থেকে জ্ঞানার্জন করেছে এবং হাদীস থেকেও জ্ঞানার্জন করেছে। এরপর তিনি আমাদেরকে আমানত তুলে নেওয়া সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন, “মানুষ এক ঘুম ঘুমাবে আর তার অন্তর থেকে আমানত তুলে নেওয়া হবে। তখন একটি বিন্দুর মত তার চিহ্ন অবশিষ্ট থাকবে। পুনরায় এক ঘুম ঘুমাবে। আবারো তার অন্তর থেকে আমানত উঠিয়ে নেওয়া হবে। তখন আগুনের আঙ্গারার মত তার চিহ্ন অবশিষ্ট থাকবে, যেমন একটি আঙ্গারা তোমার পা দিয়ে মাড়িয়েছ আর তার ফলে ফোস্কা পড়েছে। তুমি ফোস্কাটি ফোলা দেখবে; কিন্তু বাস্তবে তাতে কিছুই থাকবে না।” অতঃপর (উদাহরণ স্বরূপ) তিনি একটি কাঁকর নিয়ে নিজ পায়ে গড়িয়ে দিলেন। (তারপর বলতে লাগলেন,) “সে সময় লোকেরা বেচা-কেনা করবে কিন্তু প্রায় কেউই আমানত আদায় করবে না। এমনকি লোকে বলাবলি করবে যে, অমুক বংশে একজন আমানতদার লোক আছে। এমনকি (দুনিয়াদার) ব্যক্তি সম্পর্কে মন্তব্য করা হবে, সে কতই না অদম্য! সে কতই না বিচক্ষণ! সে কতই না বুদ্ধিমান! অথচ তার অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণ ঈমানও থাকবে না।” (হুযাইফা বলেন,) ইতিপূর্বে আমার উপর এমন যুগ অতিবাহিত হয়ে গেছে, যখন কারো সাথে বেচাকেনা করতে কোন পরোয়া করতাম না। কারণ সে মুসলিম হলে তার দ্বীন তাকে আমার (খিয়ানত থেকে) বিরত রাখবে। আর খ্রিষ্টান অথবা ইয়াহুদী হলে তার শাসকই আমার হক ফিরিয়ে দেবে। কিন্তু বর্তমানের অবস্থা হচ্ছে এই যে, আমি অমুক অমুক ছাড়া বেচা-কেনা করতে প্রস্তুত নই।
মুত্তাফাকুন ‘আলাইহি (বুখারী ও মুসলিম)।হাদীসটি স্পষ্ট করে যে, আমানত ধীরে ধীরে হ্রাস পাবে। যখন তার প্রথম অংশ দূর হবে তখন তার অন্তরের নূর দূর হয়ে যাবে। আর তার পরিবর্তে রেখে যাবে বিন্দুর ন্যায় অন্ধকার। এটি হচ্ছে পূর্বের রং এর বিপরীত রং। তারপর যখন আরো কিছু আমানত দূর হবে, তখন আঙ্গারার ন্যায় হয়ে যাবে। এটি কঠিন দাগ যা সহজে দূর হবে না। তবে অনেক সময় পর। এটি তার পূর্বে অন্ধকার থেকে অধিক অন্ধাকার। অন্তরে নূর ডেলে দেওয়ার পর তা দূর হয়ে যাওয়া এবং স্থান করে নেওয়ার পর তা বের হয়ে যাওয়া এবং তারপর তাতে অন্ধকার জায়গা করে নেওয়াকে তুলনা করেছেন একটি জ্বলন্ত অগ্নি কয়লার সাথে যা পায়ে পড়ে তাতে ফোস্কা সৃষ্টি করল তারপর কয়লা দূর হলো এবং ফোস্কা অবশিষ্ট থাকল। অতঃপর (উদাহরণ স্বরূপ) তিনি একটি কাঁকর নিয়ে নিজ পায়ে গড়িয়ে দিলেন। এ দ্বারা বর্ণনাটি অধিক ও স্পষ্ট করতে চাইলেন। “সে সময় লোকেরা সে ঘুম থেকে ভোর করবে যে ঘুমের ঘরে আমানত তুলে নেওয়া হয়েছে। তারা বেচা-কেনা করবে কিন্তু তাদের কেউই আমানত আদায় করার কাছাকাছি থাকবে না, বাস্তবিকপক্ষে আদায় করবে দূরের কথা। এমনকি এ গুনটি কম হওয়া ও তার প্রসিদ্ধির কারণে লোকেরা বলাবলি করবে যে, অমুক বংশে একজন আমানতদার লোক আছে। এমনকি (দুনিয়াদার) ব্যক্তি সম্পর্কে মন্তব্য করা হবে, সে কতই না অদম্য! সে কতই না বিচক্ষণ! সে কতই না বুদ্ধিমান! অথচ যে আমানতদারিতা ইমানের আলামত তাতো দূরের কথা তার অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণ ঈমানও থাকবে না।” (হুযাইফা বলেন,) ইতিপূর্বে আমার উপর এমন যুগ অতিবাহিত হয়ে গেছে, যখন কারো সাথে বেচাকেনা করতে কোন পরোয়া করতাম না। অর্থাৎ কারো সাথে বেচা-কেনা করতে পরওয়া করতাম না কারণ আমরা জানতাম যে, আমানত তুলে নেওয়া হয়নি। মানুষের মধ্যে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করার প্রচলন ছিল। তাই মানুষের প্রতি ভরসা রেখে এবং তাদের আমানত দারিতার প্রতি লক্ষ্য করে তার অবস্থা সম্পর্কে অনুসন্ধান না করে তার সাথে বেচা-কেনায় অগ্রসর হতাম। কিন্তু বর্তমানের অবস্থা হচ্ছে এই যে, আমি অমুক অমুক ছাড়া বেচা-কেনা করতে প্রস্তুত নই। অর্থাৎ কতক লোক যাদের আমি চিনি এবং তাদের প্রতি আস্থা রাখি। আল্লামা কিরমানি বলেন, যদি বলি আমানত তুলে নেওয়া রাসূলের যামায় প্রকাশ পেয়েছিল।
আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত: এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট (বসে) ছিল। অতঃপর এক ব্যক্তি তাঁর পাশ দিয়ে অতিক্রম করল। (যে বসেছিল) সে বলল, ‘হে আল্লাহর রসূল! নিঃসন্দেহে আমি একে ভালবাসি।’ (এ কথা শুনে) নবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, “তুমি কি (এ কথা) তাকে জানিয়েছ?” সে বলল, ‘না।’ তিনি বললেন, “তাকে জানিয়ে দাও।” সুতরাং সে (দ্রুত) তার পিছনে গিয়ে (তাকে) বলল, ‘আমি আল্লাহর ওয়াস্তে তোমাকে ভালবাসি।’ সে বলল, ‘যাঁর ওয়াস্তে তুমি আমাকে ভালবাস, তিনি তোমাকে ভালবাসুন।’
এটি নাসাঈ বর্ণনা করেছেন। - এটি আবূ দাঊদ বর্ণনা করেছেন। - এটি আহমাদ বর্ণনা করেছেন।হাদীসটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশ—কেউ যদি কাউকে ভালোবাসে সে যেন তা তাকে জানিয়ে দেয়—এর বাস্তবায়ন। এটি রাসূলুল্লাহ ও আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর মাঝে কথোপকথন। তিনি যখন বললেন, আমি এ লোকটিকে ভালোবাসি, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, তুমি কি তাকে বিষয়টি জানিয়েছ? এটি প্রমাণ করে যে, সুন্নাত হলো যখন কোন মুসলিম কোন ব্যক্তিকে ভালোবাসে সে যেন তাকে বলে, আমি তোমাকে ভালোবাসী। কারণ, এ বাক্যের মধ্যে নিহিত রয়েছে তার অন্তরেও মহব্বত ডেলে দেওয়া। কারণ, যখন কোন মানুষ জানবে যে, তার কোন ভাই তাকে মহব্বত করে সেও তাকে মহব্বত করবে। যদিও মুখে কোন কিছু না বলা সত্বেও একটি অন্তর অপর অন্তরের প্রতি ভালোবাসা ও পরিচিতি রয়েছে। যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, রুহসমূহ সংঘটিত সৈন্য দলের মতো। যাকে চিনবে তার সাথে মহব্বত সৃষ্টি হবে আর যাকে চিনবে না তার সাথে বিরোধ করবে। কিন্তু যদি মানুষ মুখে বলে, তখন তা অন্তরে মহব্বতকে বাড়িয়ে দেয়। তখন সে বলবে, আমি তোমাকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসী।
আবূ শুরাইহ খুয়াইলিদ ইবনে আমর আল খুযায়ী নবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন অবশ্যই মেহমানের পারিতোষিকসহ তার সম্মান করে।” লোকেরা বলল, ‘তার পারিতোষিক কী? হে আল্লাহর রাসূল!’ তিনি বললেন, “একদিন ও একরাত (উত্তমভাবে পানাহারের ব্যবস্থা করা)। আর সাধারণতঃ মেহমানের খাতির তিন দিন পর্যন্ত। তিনদিনের অতিরিক্ত হবে মেহমানের ওপর সাদকাহ স্ব¦রূপ।” মুসলিমের এক বর্ণনায় আছে, “কোন মুসলিমের জন্য তার ভাইয়ের নিকট এতটা থাকা বৈধ নয়, যাতে সে তাকে গোনাহগার করে ফেলে।” লোকেরা জিজ্ঞাসা করল, ‘হে আল্লাহর রাসূল! তাকে কিভাবে গোনাহগার করে ফেলে?’ উত্তরে তিনি বললেন, “মেহমান মেযবানের কাছে অবস্থান করতে থাকে, অথচ ওর এমন কিছু থাকে না, যার দ্বারা সে মেহমানের খাতির করতে পারে।”
উভয় বর্ণনা মুত্তাফাকুন আলাইহি (বুখারী ও মুসলিম)।আবূ শুরাইহ খুয়াইলিদ ইবনে আমর আল খুযায়ী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর হাদীস মেহমানের সম্মান ও মেহমানদারি করার প্রমাণ। তার থেকে বর্ণিত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন অবশ্যই মেহমানের পারিতোষিকসহ তার সম্মান করে।” এটি মেহমানের সম্মান করার ওপর উৎসাহ প্রদান ও উদ্বুদ্ধ করনের পদ্ধতি থেকে। অর্থাৎ, মেহমানের সম্মান করা আল্লাহ ও আখিরাত দিবসের প্রতি ঈমানের আলামত এবং আল্লাহ ও আখিরাত দিবসের প্রতি ঈমানের পরিপূর্ণতা। যে সব কর্ম দ্বারা মেহমানের সম্মান করা হয় যেমন: হাসি মুখ, সুন্দর কথা, তিনদিন খাওয়ানো। প্রথম দিন তার সাধ্য অনুযায়ী। আর বাকী দিন কোন প্রকার কৃত্রিমতা ছাড়া যা উপস্থিত থাকে তা দ্বারা যাতে তার ওপর এবং আত্মার ওপর বোঝা না হয়ে যায়। আর তিনদিন পর হবে সাদকা স্বরূপ, ইচ্ছা করলে করবে না হয় করবে না। আর তার বাণী: “সে যেন অবশ্যই মেহমানের পারিতোষিকসহ তার সম্মান করে। আর মেহমানদারি তিনদিন।” উলামাগণ পারিতোষিকের অর্থ সম্পর্কে বলেন, একদিন এক রাত মেহমানের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া সম্ভাব্য কল্যাণকামি পদর্শন ও সৎ ব্যবহার করা। আর দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিন তাকে তাই খেতে দেবে যা তার জন্য সহজ হয়। তার সাধারণ খাদ্যের ওপর বাড়তি করতে হবে না। আর তিনদিন পর তা হবে সাদকাহ স্বরূপ ও হিতকামনা, যদি চায় করবে আর যদি না চায় করবে না। মুসলিমের বর্ণনায় বর্ণিত: “কোন মুসলিমের জন্য তার ভাইয়ের নিকট এতটা থাকা বৈধ নয়, যাতে সে তাকে গোনাহগার করে ফেলে”। এর অর্থ, মেহমানের জন্য তার নিকট তিনদিনের বেশি অবস্থান করা ঠিক হবে না যাতে তাকে গুনাহে ফেলে দেয়। কারণ, অনেক সময় সে লম্বা সময় অবস্থানের কারণে তার সমালোচনা করবে, তার থেকে এমন কিছু প্রকাশ পাবে যা তাকে কষ্ট দেয় অথবা তার প্রতি এমন ধারণা করবে যা অবৈধ। এ গুলো সবই তখন হয় যখন মেজবানের আকাংখা ছাড়া তিনদিনের বেশি অবস্থান করে। জানা থাকা দরকার যে, মেহমানের অবস্থা অনুযায়ী তার সম্মান করা বিভিন্ন হয়ে থাকে। কতক মানুষ আছে কাওমের সরদার এবং মুখপাত্র, তখন তার মেহমানদারি তার অবস্থান অনুযায়ী হবে। আবার কতক আছে মধ্যবৃত্ত তখন তার মেহমাদারি তার অবস্থান অনুযায়ী আবার কতক আছে নিম্ন তাকে তার অবস্থান অনুযায়ী।
আবূ হুরাইরাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে প্রশ্ন করা হল যে, ‘হে আল্লাহর রাসূল! মানুষের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি কে?’ তিনি বললেন, “তাদের মধ্যে যে সবচেয়ে আল্লাহ-ভীরু।” অতঃপর তাঁরা (সাহাবীরা) বললেন, ‘এ ব্যাপারে আমরা আপনাকে জিজ্ঞাসা করছি না।’ তিনি বললেন, “তাহলে ইউসুফ (সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি), যিনি স্বয়ং আল্লাহর নবী, তাঁর পিতা নবী, পিতামহও নবী এবং প্রপিতামহও নবী ও আল্লাহর বন্ধু।” তাঁরা বললেন, ‘এটাও আমাদের প্রশ্ন নয়।’ তিনি বললেন, “তাহলে তোমরা কি আমাকে আরবের বংশাবলী সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করছ? (তবে শোন!) তাদের মধ্যে যারা জাহেলী যুগে ভালো, তারা ইসলামেও ভালো; যদি দ্বীনী জ্ঞান শিখে।”
মুত্তাফাকুন ‘আলাইহি (বুখারী ও মুসলিম)।বংশ, মূল ও গোড়ার দিক বিবেচনায় সম্মানিত ব্যক্তি হলো যারা জাহিলিয়্যাতের যুগে সম্মানি। তবে শর্ত হলো যখন তারা দীন সম্পর্কে জানবে। যেমন, বনু হাশেম সম্পর্কে এ কথা প্রসিদ্ধ যে তারা ইসলামের কুরাইশদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানি। তবে শর্ত হলো তারা আল্লাহর দীন ব্যাপারে জ্ঞাত এবং দীনের বিধানাবলী জানতে হবে। যদি দীনের বিষয়ে তাদের কোন জ্ঞান না থাকে তবে বংশীয় মর্যাদা তার কোন উপকারে আসবে না। যদিও সে উচ্চ বংশের এবং আরবদের মধ্যে বংশীয় ও শিকড়ের দিক দিয়ে অনেক উচ্চ হয়ে থাকে। সে আল্লাহর নিকট সম্মানি কোন ব্যক্তি নন এবং সে কোন উত্তম ব্যক্তিও নন। সুতরাং মানুষ তার বংশের কারণে সম্মানের অধিকারী হবেন। তবে শর্ত হলো তার কাছে দীনের জ্ঞান থাকতে হবে।