





























Hadeeth Cards
Da'wa cards that highlight great meanings from the noble prophetic hadiths in a simple style and attractive display that helps the Muslim to have a deeper understanding of his religion in an easy way
All
আবূ মুলাইকা হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রীদের একজন থেকে বর্ণিত — আবু আমির বলেন, নাফি' বলেন: আমি মনে করি তিনি (সেই স্ত্রী) ছিলেন হাফসা। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কিরাআত সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হলে বললেন: তোমরা তা করতে পারবে না। তখন তাঁকে বলা হলো: আমাদেরকে সেটি বর্ণনা করে দিন। তখন তিনি একটি ধীরে-ধীরে, স্পষ্ট উচ্চারণে কিরাআত পড়লেন। আবু আমির বলেন, নাফি' বলেন: আমাদেরকে ইবনু আবি মুলাইকা হাদীসটি হুবহু বর্ণনা করলেন: الحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ} [الفاتحة: 2] — তারপর থামলেন, {الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ} [الفاتحة: 1] — তারপর আবার থামলেন, {مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ} — তারপর আবার থামলেন।৪
এটি আহমাদ বর্ণনা করেছেন।হাফসা রাদিয়াল্লাহু আনহা, যিনি ছিলেন মু’মিনদের মা, তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিভাবে কুরআন তিলাওয়াত করতেন? তিনি বললেন: তোমরা তাঁর মতো (তিলাওয়াত) করতে সক্ষম হবে না। তখন তাকে বলা হলো: আমাদেরকে জানিয়ে দিন (তিনি কিভাবে তিলাওয়াত করতেন)। নাফি‘ বলেন: ইবনু আবি মুলাইকা আমাদের সামনে ধীরে-সুস্থে কিরাআত করলেন, যাতে তিনি তাদের জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কিরাআতের ধরণটি তুলে ধরতে ও নিকটবর্তী করতে পারেন। তিনি এভাবে তিলাওয়াত করলেন: {الحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ} — এরপর থামলেন, {الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ} — এরপর আবার থামলেন, {مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ} — এরপর আবার থামলেন।
’আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: শরীর নাপাক না হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের সর্বাবস্থায় কুরআন তিলাওয়াত করাতেন।
এটি আবূ দাউদ, তিরমিযী, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ ও আহমাদ বর্ণনা করেছেন।নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বাবস্থায় তাঁর সাহাবীদের কুরআন শিক্ষা দিতেন এবং তাঁদেরকে তিলাওয়াত শোনাতেন, তবে স্ত্রী সহবাসজনিত অপবিত্র অবস্থায় (জানাবাত) না থাকলে।
আবূ সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি আরেক ব্যক্তিকে {قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَد} পড়তে শুনলেন। সে বার বার তা মুখে উচ্চারণ করছিল। পরদিন সকালে তিনি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে এ ব্যাপারে বললেন। যেন ঐ ব্যক্তি তা কম মনে করল। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “সেই সত্তার কসম, যার হাতে আমার জীবন। এ সূরা হচ্ছে সমগ্র কুরআনের এক-তৃতীয়াংশের সমান।”
এটি বুখারী বর্ণনা করেছেন।আবু সাঈদ আল-খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন যে, এক ব্যক্তি অন্য ব্যক্তিকে {قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ} সূরা তেলাওয়াত করতে এবং সারা রাত ধরে এটি আবৃত্তি করতে শুনেছেন, এতে কিছু যোগ করেননি। সকাল হলে সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে তার বিষয়টি উল্লেখ করল। প্রশ্নকারী মনে করেছিলেন যে এটি খুব কম, তাই তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জোর দেওয়ার অর্থে শপথ করে বললেন: "যার হাতে আমার প্রাণ, সেই সত্তার শপথ, এটি কুরআনের এক তৃতীয়াংশের সমান।"
আবূ হুরাইরাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর নাযিল হলোঃ {لِلَّهِ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ وَإِنْ تُبْدُوا مَا فِي أَنْفُسِكُمْ أَوْ تُخْفُوهُ يُحَاسِبْكُمْ بِهِ اللهُ فَيَغْفِرُ لِمَنْ يَشَاءُ وَيُعَذِّبُ مَنْ يَشَاءُ وَاللهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ} [البقرة: 284]، "আসমান ও যমীনে যত কিছু আছে সমস্ত আল্লাহরই। তোমাদের মনের অভ্যন্তরে যা আছে তা প্রকাশ কর কিংবা গোপন রাখ, আল্লাহ তোমাদের নিকট থেকে তার হিসাব গ্রহণ করবেন এবং যাকে ইচ্ছা তিনি ক্ষমা করবেন, যাকে ইচ্ছা শাস্তি দিবেন। আল্লাহ সবকিছুর উপর সর্বশক্তিমান"- (আল-বাকারাহ ২:২৮৪)। রাবী বলেন, তখন বিষয়টি সাহাবাদের কাছে খুবই কঠিন মনে হল। তাই তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে আসলেন এবং হাঁটু গেড়ে বসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! সালাত, সিয়াম, জিহাদ, সাদাকা প্রভৃতি যে সমস্ত আমল আমাদের সামর্থ্যানুযায়ী ছিল এ যাবৎ আমাদেরকে সেগুলোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বর্তমানে আপনার ওপর এ আয়াত নাযিল হয়েছে। এ বিষয়টি তো আমাদের ক্ষমতার বাইরে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “আহলে কিতাব-ইয়াহুদী ও খৃষ্টানের ন্যায় তোমরাও কি এমন কথা বলবে যে, শুনলাম কিন্তু মানলাম না? বরং তোমরা বল; শুনলাম ও মানলাম। হে আমাদের রব! আমরা তোমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি, আর তোমার কাছেই আমরা ফিরে যাব”। তারা বললেন, আমরা শুনেছি ও মেনেছি, হে আমাদের রব! আমরা তোমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি, তুমিই আমাদের শেষ প্রত্যাবর্তনস্থল। রাবী বলেন, সাহাবীগণ এ আয়াত পাঠ করলেন এবং মনেপ্রাণে তা গ্রহণ করে নিলেন। তারপর আল্লাহ তা’আলা নাযিল করেন: {آمَنَ الرَّسُولُ بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْهِ مِنْ رَبِّهِ وَالمُؤْمِنُونَ كُلٌّ آمَنَ بِاللهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِنْ رُسُلِهِ وَقَالُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا غُفْرَانَكَ رَبَّنَا وَإِلَيْكَ المَصِيرُ} [البقرة: 285] “রাসূল ঈমান এনেছেন তার প্রতি তার প্রতিপালকের পক্ষ হতে যা অবতীর্ণ হয়েছে এবং মুমিনগণও তাদের সকলেই আল্লাহর, তার ফেরেশতাগণের, তার কিতাবসমূহের এবং তার রাসূলগণের ঈমান এনেছে। (তারা বলে) আমরা তার রাসূলগণের মধ্যে কোন তারতম্য করি না। আর তারা বলে, আমরা শুনলাম এবং মানলাম! হে আমাদের রব! আমরা তোমার নিকট ক্ষমা চাই আর তোমারই নিকট আমাদের প্রত্যাবর্তনস্থল- (আল-বাকারাহ ২:২৮৫)। যখন তারা সর্বোতভাবে আনুগত্য প্রকাশ করলেন, তখন আল্লাহ তা’আলা উক্ত আয়াতের হুকুম রহিত করে নাযিল করলেনঃ {لَا يُكَلِّفُ اللهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا لَهَا مَا كَسَبَتْ وَعَلَيْهَا مَا اكْتَسَبَتْ رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِنْ نَسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا} [البقرة: 286] "আল্লাহ কারো উপর এমন কোন কষ্টদায়ক দায়-দায়িত্ব অর্পণ করেন না যা তার পক্ষে করা অসম্ভব। সে ভাল যা উপার্জন করে তা তারই এবং মন্দ যা উপার্জন করে তাও তারই। হে আমাদের রব! যদি আমরা ভুলে যাই কিংবা ভুল করে ফেলি তবে তুমি আমাদেরকে পাকড়াও করো না।" আল্লাহ তা’আলা বললেন, “হ্যাঁ, কবুল করলাম”। আরো ইরশাদ হলঃ {رَبَّنَا وَلَا تَحْمِلْ عَلَيْنَا إِصْرًا كَمَا حَمَلْتَهُ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِنَا} [البقرة: 286 "হে আমাদের প্রতিপালক আমাদের পূর্ববর্তীগণের উপর যেমন গুরু দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন, আমাদের উপর তেমন দায়িত্ব অর্পণ করো না”। আল্লাহ তা’আলা বললেনঃ “হ্যাঁ, কবুল করলাম”। আরো ইরশাদ হলঃ {رَبَّنَا وَلَا تُحَمِّلْنَا مَا لَا طَاقَةَ لَنَا بِهِ} [البقرة: 286] "হে আমাদের রব! এমন ভার আমাদের উপর অর্পণ করো না, যা বহন করার শক্তি আমাদের নেই।" আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ “হ্যাঁ, কবুল করলাম”। আরো ইরশাদ হল, {وَاعْفُ عَنَّا وَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا أَنْتَ مَوْلَانَا فَانْصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الكَافِرِينَ} [البقرة: 286] "আমাদের পাপ মোচন কর, আমাদেরকে ক্ষমা করে দাও, আমাদের উপর দয়া কর, তুমিই আমাদের অভিভাবক। সুতরাং কাফির সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদেরকে বিজয় দান কর”। আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ “হ্যাঁ, কবুল করলাম”।
ইমাম মুসলিম এটি বর্ণনা করেছেনযখন আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর নাুযিল করলেন: {لِلَّهِ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ} “আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে, তা আল্লাহরই” —তিনি সেগুলোর স্রষ্টা, মালিক, তত্ত্বাবধায়ক ও পরিচালনাকারী। {وَإِنْ تُبْدُوا} “যদি তোমরা প্রকাশ কর” {مَا فِي أَنْفُسِكُمْ} যা তোমাদের অন্তরে ও হৃদয়ে বিদ্যমান; {أَوْ تُخْفُوهُ} অথবা তা গোপন কর, {يُحَاسِبْكُمْ بِهِ اللَّهُ} “আল্লাহ সেসবের হিসাব নেবেন কিয়ামতের দিন”। {فَيَغْفِرُ لِمَنْ يَشَاءُ} “অতঃপর তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করবেন” — নিজের অনুগ্রহ ও দয়ার মাধ্যমে, {وَيُعَذِّبُ مَنْ يَشَاءُ} “আর যাকে ইচ্ছা শাস্তি দেবেন” — তাঁর ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে। {وَاللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ} “আর আল্লাহ সব কিছুর উপর সর্বক্ষমতাধর” — তাঁকে কোনো কিছু অক্ষম করে দিতে পারে না। সাহাবাগণ যখন এই আয়াতটি শুনলেন, তখন এটি তাঁদের জন্য কঠিন মনে হলো, কারণ এতে এমনটিও আছে যে — হৃদয়ের ভিতরের চিন্তা-ভাবনার জন্যও জবাবদিহি করা হবে। তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এলেন, অতঃপর হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন এবং বললেন: হে আল্লাহর রাসূল! এর আগে আমাদেরকে যে সব শারীরিক ইবাদতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল — যেমন: সালাত, সিয়াম, জিহাদ, সদকা — আমরা সেগুলো পালন করতে সক্ষম ছিলাম। কিন্তু এখন আপনার ওপর এমন একটি আয়াত নাযিল হয়েছে, যা পালন করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের বললেন: তোমরা কি ইহুদী ও খ্রিস্টানদের মতো বলতে চাও: {سَمِعْنَا وَعَصَيْنَا}؟ ‘আমরা শুনেছি কিন্তু অমান্য করেছি’? বরং তোমরা বলো: {سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا غُفْرَانَكَ رَبَّنَا وَإِلَيْكَ المَصِيرُ} 'আমরা শুনেছি এবং মান্য করেছি। হে আমাদের রব, তোমার ক্ষমা চাই, আর তোমার দিকেই প্রত্যাবর্তন হবে।' সাহাবীগণ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আদেশ মেনে নিলেন এবং বললেন: আমরা শুনেছি এবং মান্য করেছি। হে আমাদের রব, তোমার ক্ষমা চাই, আর তোমার দিকেই প্রত্যাবর্তন। যখন মুসলিমরা তা নিজেদের জিহ্বা দিয়ে বলল এবং তাদের অন্তরও তা বিনয়সহকারে গ্রহণ করল, তখন আল্লাহ তাআলা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর উম্মতের প্রশংসা করে আয়াত নাযিল করলেন: {آمَنَ الرَّسُولُ بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْهِ مِنْ رَبِّهِ وَالمُؤْمِنُونَ} “রাসূল ঈমান এনেছেন তার প্রভুর পক্ষ থেকে যা কিছু নাযিল হয়েছে এবং মুমিনরাও”। তারা নিজেদের জিহ্বা ও অন্তর দিয়ে আল্লাহর আদেশের প্রতি সম্পূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করেছে। {كُلٌّ آمَنَ بِاللَّهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِنْ رُسُلِهِ}. “সবাই ঈমান এনেছে আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেশতাগণের প্রতি, তাঁর কিতাবসমূহের প্রতি এবং তাঁর রাসূলদের প্রতি। আমরা তাঁর রাসূলদের মধ্যে কোনো পার্থক্য করি না।” বরং আমরা সকল নবী ও রাসূলদের প্রতি ঈমান এনেছি। তারা বলেছে: {وَقَالُوا سَمِعْنَا} “আমরা শুনেছি” —তোমার বাণী, {وَأَطَعْنَا} “এবং আমরা মান্য করেছি”— তোমার আদেশ, আর আমরা বলি: {غُفْرَانَكَ رَبَّنَا} “হে আমাদের পালনকর্তা! আমরা তোমার ক্ষমা প্রার্থনা করি,” {وَإِلَيْكَ الْمَصِيرُ} “আর কিয়ামতের দিন তোমারই দিকে ফিরে যাওয়া আমাদের।” যখন তারা এ কথাগুলো বলল এবং আল্লাহর আদেশের প্রতি শ্রবণ ও আনুগত্য প্রকাশ করল, তখন আল্লাহ তাআলা এই উম্মতের জন্য তা সহজ করে দিলেন এবং আগের আয়াতকে রহিত (নাসিখ) করে এ আয়াত নাজিল করলেন: {لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا} {“আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেন না”} — অর্থাৎ তার সামর্থ্য, শক্তি ও পরিশ্রম অনুযায়ীই তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। {لَهَا} {তার জন্য রয়েছে {مَا كَسَبَتْ} সে যা উপার্জন করেছে (ভালো কাজের প্রতিদান), {وَعَلَيْهَا} আর তার ওপর রয়েছে {مَا اكْتَسَبَتْ} সে যা সে অর্জন করেছে (পাপ ও গোনাহের শাস্তি)। আল্লাহ কাউকে অন্যের গোনাহের কারণে শাস্তি দেন না এবং অন্তরের কু-চিন্তা বা কু-বাসনার জন্যও কাউকে পাকড়াও করেন না। {رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا} “হে আমাদের রব! {إِنْ نَسِينَا} যদি আমরা ভুলে যাই, তাহলে আমাদেরকে পাকড়াও করো না, {أَوْ أَخْطَأْنَا} আর যদি আমরা ভুল করি, অনিচ্ছাকৃতভাবে সঠিক কাজ থেকে বিচ্যুত হই, তাতে আমাদেরকে শাস্তি দিও না। আল্লাহ তাআলা তাঁদের এই দোয়ার উত্তর দিলেন এবং বললেন: “হ্যাঁ, আমি তা করে দিয়েছি।” {رَبَّنَا وَلَا تَحْمِلْ عَلَيْنَا إِصْرًا} “হে আমাদের রব! আমাদের ওপর এমন ভার (দায়িত্ব ও কষ্ট) আরোপ করো না, {كَمَا حَمَلْتَهُ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِنَا} যেমন তুমি আগের জাতিদের ওপর করেছিলে”— যেমন বনু ইসরাইল ও অন্যান্যদের ওপর কঠিন বিধান ও বোঝা চাপানো হয়েছিল। আল্লাহ এই দোয়ার জবাব দিলেন এবং বললেন: “হ্যাঁ, আমি তা করে দিয়েছি।” {رَبَّنَا وَلَا تُحَمِّلْنَا مَا لَا طَاقَةَ لَنَا بِهِ} “হে আমাদের রব! আমাদের ওপর এমন কিছু চাপিয়ে দিও না, যার সামর্থ্য আমাদের নেই,” — যেমন কঠিন দায়িত্ব, পরীক্ষা বা বিপদ যা আমরা বহন করতে অক্ষম। আল্লাহ তা‘আলা বললেন: “হ্যাঁ, আমি তা করে দিয়েছি।” {وَاعْفُ عَنَّا} “আর আমাদের গোনাহ মাফ করে দাও,” — আমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করো এবং সেগুলো দূর করে দাও। {وَاغْفِرْ لَنَا} “আমাদের গোনাহগুলো ক্ষমা করো,” — আমাদের পাপগুলো ঢেকে রাখো এবং সেগুলোর ব্যাপারে ধরবেন না। {وَارْحَمْنَا} “আমাদের ওপর দয়া করো,” — তোমার অবারিত রহমতের মাধ্যমে। {أَنْتَ مَوْلَانَا} “তুমিই তো আমাদের অভিভাবক ও নেতা,” {فَانْصُرْنَا} “অতএব, তুমি আমাদেরকে সাহায্য করো,” — কুফরির বিরুদ্ধে সত্যের পক্ষে বিজয় দান করে, {عَلَى الْقَوْمِ الكَافِرِينَ} “কাফির সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে,” — তাদের সঙ্গে জিহাদ ও লড়াইয়ে। আল্লাহ তাআলা তাঁদের এই সব দোয়ার জবাব দিলেন এবং বললেন: “হ্যাঁ, আমি তা করে দিয়েছি।
‘উমার ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত: জনৈক ইয়াহূদী তাঁকে বললঃ হে আমীরুল মু’মিনীন! আপনাদের কিতাবে একটি আয়াত আছে, যা আপনারা পাঠ করে থাকেন, তা যদি আমাদের ইয়াহুদী জাতির উপর অবতীর্ণ হত, তবে অবশ্যই আমরা সে দিনকে খুশীর দিন হিসেবে পালন করতাম। তিনি বললেন, কোন্ আয়াত? সে বললঃ {اليَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الإِسْلاَمَ دِينًا} [المائدة: 3] ‘‘আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পরিপূর্ণ করলাম ও তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন মনোনীত করলাম’’- (মায়িদাহ্ ৫/৩)। ‘উমার বললেন, এটি যে দিনে এবং যে স্থানে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর উপর অবতীর্ণ হয়েছিল তা আমরা জানি; তিনি সেদিন ‘আরাফায় দাঁড়িয়েছিলেন আর সেটা ছিল জুমু‘আহর দিন।
সহীহ বুখারী ও মুসলিমএকজন ইহুদি ব্যক্তি আমীরুল মু’মিনীন উমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু-এর কাছে এসে বলল: তোমাদের কিতাব কুরআনে একটি আয়াত আছে, সেটি যদি আমাদের (ইহুদিদের) কিতাব তাওরাতে নাযিল হতো, তাহলে আমরা সেই দিনটিকে একটি উৎসবের দিন হিসেবে পালন করতাম — এই মহান আয়াত নাযিল হওয়ার শুকরিয়ায়। তখন উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু তাকে জিজ্ঞেস করলেন: কোন আয়াত? তিনি বললেন, {اليَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الإِسْلاَمَ دِينًا} “আজকের দিন আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করছি। আর তোমাদের ওপর আমার নিআমতকে সম্পন্ন করছি। আর ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে পছন্দ করছি।” উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বললেন: আমরা সেই দিন এবং সেই স্থান সম্পর্কে জানি, যেখানে এই মহামূল্যবান আয়াতটি নাযিল হয়েছিল। এটি ঈদের দিন নাযিল হয়েছিল, আর তা ছিল জুমার দিন, যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরাফার ময়দানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এই দুই দিন মুসলমানদের নিকট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ
ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আল্লাহ্ তা‘আলা এই আয়াতগুলো নাযিল করেছেন: {وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ} — “আর যারা আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তা অনুযায়ী বিচার করে না, তারাই কাফির”। [আল-মায়েদা:৪৪] {فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ} — “তারা জালিম।” [মায়েদা:৪৫] {فَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ} — “তারা ফাসিক।” [মায়েদা: ৪৭] বর্ণনাকারী বলেন, ইবনু আব্বাস বলেছেন, এই আয়াতগুলো আল্লাহ্ ইহুদিদের দুইটি গোত্র সম্পর্কে নাযিল করেছেন। জাহিলি যুগে তাদের একটি দল অপর দলটির উপর প্রভাব বিস্তার করেছিল। অবশেষে তারা আপস করেছিল যে, শক্তিশালী দলের কেউ দুর্বল দলের কাউকে হত্যা করলে এর বদলে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে ৫০ ওয়াসক, আর দুর্বল দলের কেউ শক্তিশালী দলের কাউকে হত্যা করলে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে ১০০ ওয়াসক। তারা এ চুক্তিতেই চলছিল। তারা এই অবস্থাতেই ছিল, যতক্ষণ না নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনায় আগমন করেন। এরপর যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনায় আগমন করলেন, তখন উভয় দলই তাঁর আগমনের কারণে দুর্বল ও আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। তখনও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিজয় লাভ করেননি এবং তাদের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেননি; তিনি তখন সন্ধির অবস্থায় ছিলেন। এ সময় দুর্বল দলটি শক্তিশালী দলের একজনকে হত্যা করে। তখন শক্তিশালী দলটি দুর্বল দলটিকে বার্তা পাঠায়: আমাদের ১০০ ওয়াসক ক্ষতিপূরণ পাঠাও। দুর্বল দলটি বলে: আমরা কি কখনো এক জাতি ও এক ধর্মে ছিলাম না? আমাদের বংশ ও এলাকা তো এক! তাহলে একদলের ক্ষতিপূরণ অন্য দলের অর্ধেক কেন হবে? আমরা তো অতীতে শুধু তোমাদের ভয়ে এবং নিজেদের দুর্বলতার কারণে এই অসম শর্ত মান্য করেছিলাম। কিন্তু এখন যখন মুহাম্মদ এসেছেন, তখন আমরা তোমাদেরকে এই অন্যায় শর্ত অনুযায়ী কিছু দেব না। এতে করে দুই দলের মধ্যে যুদ্ধ বাঁধার উপক্রম হয়। অবশেষে তারা সিদ্ধান্ত নেয় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বিচারক করা হবে। তখন শক্তিশালী দলটি বলে: আল্লাহর কসম, মুহাম্মদ কখনো তোমাদের থেকে তাদের জন্য যে ক্ষতিপূরণ আদায় করেন তার দ্বিগুণ ক্ষতিপূরণ তাদের থেকে তোমাদের জন্য আদায় করবেন না। তারা সত্য বলছে — তারা অতীতে কেবল আমাদের ভয়ে ও শক্তির সামনে চাপে পড়ে এই অন্যায় শর্ত মানতে বাধ্য হয়েছিলে। কাজেই তোমরা এমন একজনকে মুহাম্মদ এর নিকট গুপ্তভাবে পাঠাও যে তাঁর রায়টি তোমাদেরকে জানিয়ে দেবে: যদি তিনি তোমাদের যা চাও তা দেন, তখন তোমরা তাঁকে বিচারক করে গ্রহন করো; আর যদি না দেন, সাবধান থাকো — তোমরা তাঁকে বিচারক করবে না। তারা মুনাফিকদের মধ্য থেকে কিছু লোক গুপ্তভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে পাঠাল, যাতে তারা রাসূলের রায় তাদেরকে জানিয়ে দেয়। যখন তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে এসে পৌঁছালেন, তখন আল্লাহ্ তাঁকে তাদের সমস্ত ঘটনা এবং তাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবহিত করলেন। এরপর আল্লাহ্ তাআলা এই আয়াতসমূহ নাযিল করলেন: يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ لَا يَحْزُنْكَ الَّذِينَ يُسَارِعُونَ فِي الْكُفْرِ مِنَ الذِينَ قَالُوا آمَنَّا} [المائدة: 41] “হে রাসূল, তোমাকে যেন তারা চিন্তিত না করে, যারা কুফরে দ্রুত ছুটছে—তাদের থেকে, যারা তাদের মুখে বলে ‘ঈমান এনেছি। [আল-মায়িদা:৪১] থেকে {وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللهُ فَأُولَئِكَ هُمِ الْفَاسِقُونَ} [المائدة: 47] “আর যারা আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন তা অনুযায়ী বিচার করে না, তারাই ফাসিক।" [আল-মায়িদা: ৪৭] পর্যন্ত। ইবনু আব্বাস শেষে বললেন, এই আয়াতগুলো আল্লাহ্ এই দুই দলের সম্পর্কেই নাযিল করেছেন এবং তাদেরকেই আল্লাহ্ এখানে নির্দেশ করছেন।
এটি আহমাদ বর্ণনা করেছেন।নবী মুহাম্মদের সময় মদিনার ইহুদীদের মধ্যে ছিলেন বানু কুরায়জা এবং বানু নাযীর। জাহিলি যুগে একে অপরের উপর প্রভাব বিস্তার করেছিল এবং এক দল অপর দলকে পরাজিত করেছিল। তারা এমন একটি চুক্তিতে সম্মত হয়েছিল যে, ক্ষমতাধর দল যেসব হত্যা করেছে তাদের প্রতি নিহত ব্যক্তির দাম হবে মাত্র পঞ্চাশ ওসাক (একটি ওজনের একক), আর ক্ষমতাহীন দল যদি ক্ষমতাধর দল থেকে কাউকে হত্যা করে, তখন নিহত ব্যক্তির দাম হবে দ্বিগুণ, অর্থাৎ একশত ওসাক। এক ওসাক হল ষাট সা’ (সা‘ আরেকটি ওজনের একক)। তারা এই নিয়মে ছিল যতক্ষণ না নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় হিজরত করে আগমন করেন। তখন দুই দলই তাঁর আগমনে অনুগত হয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখনো তাঁর শত্রুদের বিরুদ্ধে বিজয় লাভ করেননি এবং তাদের ওপর তাঁর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেননি; কারণ এটি ছিল হিজরতের প্রথম সময় এবং তখন তিনি সন্ধির চুক্তি অবস্থায় ছিলেন। ইত্যবসরে ক্ষমতাহীন দল ক্ষমতাধর দলের একজন সদস্যকে হত্যা করল, ক্ষমতাধর দল ক্ষমতাহীন দলের কাছে তাদের চুক্তি অনুযায়ী একশত ওসাক পাঠানোর জন্য অনুরোধ করে। কিন্তু ক্ষমতাহীন দল বলেন: কখনো কি এমন হয়েছে যে, একই সম্প্রদায়ের দুই পক্ষের, যাদের ধর্ম একই, বংশ একই এবং শহর একই, একজনের হত্যার ক্ষতিপূরণ অন্যজনের চেয়ে দ্বিগুণ হয়?! আমরা আপনাদের এই দণ্ড দিচ্ছিলাম আপনাদের অন্যায় ও ভয়ভীতি থেকে; কিন্তু এখন মোহাম্মদ এসে পৌঁছেছেন, আমরা আর কখনোই তা দিব না। তাদের মধ্যে প্রায় যুদ্ধ শুরু হবার উপক্রম হয়, তারপর তারা সম্মত হয় যে নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের মধ্যে বিচার করবেন। পরে ক্ষমতাধর দল চিন্তা করে বলল: "আল্লাহর কসম, মুহাম্মদ তোমাদের থেকে তাদেরকে যা দেন তার দ্বিগুণ তাদের থেকে তোমাদেরকে দিবেন না। তারা সত্য বলেছে, তারা আমাদেরকে এই অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণ দিয়েছে শুধুমাত্র আমাদের অন্যায় ও তাদের উপর আমাদের প্রভাব বিস্তারের কারণে। কাজেই তোমরা গোপনে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে কাউকে পাঠাও, যে তোমাদের জন্য তাঁর মতামত নিয়ে আসবে। যদি তিনি তোমাদের চাওয়া অনুযায়ী দেন, তাহলে তোমরা তাঁকে বিচারক মানবে, আর যদি তোমাদের চাওয়া তোমাদের না দেন, তাহলে তাঁকে প্রত্যাখ্যান করবে এবং তাকে বিচারক মানবে না। তারা গোপনে কিছু মুনাফিককে নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে পাঠাল, যেন তারা তাঁর মতামত জেনে আসতে পারে। কিন্তু যখন তারা নবীর কাছে পৌঁছাল, তখন আল্লাহ ওহির মাধ্যমে তাঁর রাসূলকে তাদের সম্পূর্ণ উদ্দেশ্য ও চক্রান্ত সম্পর্কে জানিয়ে দিলেন। এরপর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা সূরা আল-মায়িদা-তে এই আয়াত নাযিল করলেন: {يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ لَا يَحْزُنكَ الَّذِينَ يُسَارِعُونَ فِي الْكُفْرِ مِنَ الَّذِينَ قَالُوا آمَنَّا} “হে রাসূল, তোমাকে যেন তারা চিন্তিত না করে, যারা কুফরে দ্রুত ছুটছে—তাদের থেকে, যারা তাদের মুখে বলে ‘আমরা ঈমান এনেছি”। [সূরা আল-মায়িদা:৪১] হতে {وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللهُ فَأُولَئِكَ هُمِ الْفَاسِقُونَ} [المائدة: 47] “আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করে না, তারাই ফাসিক”। [মায়েদা:৪৭] তারপর ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, আল্লাহর কসম, আল্লাহ তাদের ব্যাপারেই নাযিল করেছেন: {وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللهُ فَأُولَئِكَ هُمِ الْكَافِرُونَ} [المائدة: 44] “আর যারা আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তা অনুযায়ী বিচার করে না, তারাই তো কাফের”। [আল-মায়িদা: ৪৪] এবং و{...فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ} [المائدة: 45] "...তাহলে তারাই তো জালিম"। [মায়েদা:৪৫] আর {...فَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ} [المائدة: 47] "…তাহলে তারাই তো ফাসিক”। [আল-মায়িদা:৪৭], — প্রকৃতপ্রস্তাবে আল্লাহ্ তা‘আলা এই দুই সম্প্রদায়কে উদ্দেশ্য করেছেন।
ইবনু ‘উমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "গায়েবের চাবি পাঁচটি" — {إِنَّ اللَّهَ عِندَهُ عِلْمُ السَّاعَةِ، وَيُنَزِّلُ الْغَيْثَ، وَيَعْلَمُ مَا فِي الْأَرْحَامِ، وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ مَاذَا تَكْسِبُ غَدًا، وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ بِأَيِّ أَرْضٍ تَمُوتُ، إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ} — “নিশ্চয় আল্লাহ্, তাঁর কাছেই রয়েছে কিয়ামতের জ্ঞান, তিনি বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং তিনি জানেন যা মাতৃগর্ভে আছে। আর কেউ জানে না আগামীকাল সে কি অর্জন করবে এবং কেউ জানে না কোন্ স্থানে তার মৃত্যু ঘটবে। নিশ্চয় আল্লাহ্ সর্বজ্ঞ, সম্যক অবহিত”।
এটি বুখারী বর্ণনা করেছেন।গায়েবের ইলম আল্লাহ্র কাছেই আছে, তিনি ছাড়া কেউ তা জানে না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের জানিয়েছেন যে, গায়েবের চাবিকাঠি ও তার ভাণ্ডার পাঁচটি। প্রথমটি: কিয়ামত কখন ঘটবে তা আল্লাহ্ ছাড়া কেউ জানে না। এটি আখিরাতের ইলমের প্রতি ইঙ্গিত করে। কারণ আখিরাতের শুরু হল কিয়ামতের দিন, যিনি কাছাকাছির ইলম রাখেন না, তার জন্য পরবর্তী ইলম রাখা সম্ভব নয়। দ্বিতীয়টি: বৃষ্টি কখন বর্ষিত হবে তা আল্লাহ্ ছাড়া কেউ জানে না। এটি উর্ধ্বজগতের বিষয়গুলোর প্রতি ইঙ্গিত করে। বৃষ্টিকে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যদিও তার আলামত রয়েছে, যা অভ্যাস অনুযায়ী বৃষ্টির সম্ভাবনা বোঝায়, কিন্তু তা নিশ্চিত এবং নিঃসন্দেহ নয়। তৃতীয়টি হলো—গর্ভে যা থাকে: ছেলে বা মেয়ে, কালো বা সাদা, সম্পূর্ণ বা অসম্পূর্ণ, দুর্ভাগা বা সুখী ইত্যাদি। গর্ভকে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে কারণ অধিকাংশ মানুষ সাধারণত এ বিষয়গুলো সম্পর্কে জানে; তবুও কেউ এর প্রকৃত রহস্য জানে না, কাজেই অন্যান্য বিষয়গুলো আরও আগেই জানবে না। চতুর্থটি: আগামীকাল কী ঘটবে তা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। এটি সময়ের বিভিন্ন প্রকার এবং তাতে সংঘটিত ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করে। ‘আগামীকাল’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে যাতে এর অর্থ সবচেয়ে কাছাকাছি সময় বোঝায়। যদি কেউ এত কাছের সময়ের ঘটনাগুলোও না জানে, যদিও সম্ভবত কোনো নিদর্শন বা লক্ষণ থেকে ধারণা করা যায়, তবে দূরের সময়ের ঘটনা জানা আরও কঠিন হবে। পঞ্চমটি: কেউ জানে না সে কোন যমীনে মারা যাবে, এটি পৃথিবীর নীচের জগতের বিষয়গুলোর প্রতি ইঙ্গিত। যদিও অধিকাংশ মানুষের সাধারণ অভ্যাস তাদের নিজ শহরেই মারা যাওয়া, কিন্তু তাই বাস্তবতা নয়। বরং যদি কেউ তার নিজ দেশে মারা যায়, তবুও সে জানে না কোন স্থানে তাকে দাফন করা হবে, যদিও সেখানে তার পূর্বপুরুষদের কবরস্থলও থাকে। {إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ} “নিশ্চয়ই আল্লাহ জ্ঞানী, পরিপূর্ণ অবগত” — তিনি বাহ্যিক ও অন্তর্নিহিত, গোপন ও প্রকাশ্য, অন্তরঙ্গ বিষয়সমূহ সম্পর্কে সর্বজ্ঞ। এই আয়াতে গায়েব (অদৃশ্য) ইলমের বিভিন্ন প্রকারকে একত্রিত করা হয়েছে এবং সব ভ্রান্ত দাবিকে খণ্ডন করে দেওয়া হয়েছে।
নু‘মান ইবন বাশির রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: একদা আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মিম্বারের নিকটেই ছিলাম। তখন এক ব্যক্তি বলে উঠলো- ইসলাম গ্রহণের পর যদি আমি আর কোন সৎ কাজই না করি তাতে আমার কোন পরওয়া নেই; তবে আমি হাজীদেরকে পানি পান করাব। অপর একজন বলে উঠলো, মুসলিম হওয়ার পর যদি আমি আর কোন সৎ কাজই না করি তাতে আমার কোন পরোয়া নেই, তবে আমি মাসজিদুল হারামের মেরামত প্রভৃতি করে যাব। অপর একজন বলে উঠলো, আল্লাহর পথে জিহাদ করা তোমরা যা যা বলেছে তার চাইতে উত্তম। তখন উমর তাদেরকে ধমক দিয়ে বলে উঠলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মিম্বারের নিকটে তোমরা চিৎকার করো না। সেটা ছিল জুমুআর দিন। বরং যখন জুমুআর সালাত হয়ে যাবে, তখন আমি তার নিকটে গিয়ে তোমরা যে ব্যাপারে বিতর্ক করছে তা জিজ্ঞেস করে নেবো, তখন আল্লাহ তা’আলা (সে প্রেক্ষিতে) নাযিল করলেনঃ {أَجَعَلْتُمْ سِقَايَةَ الْحَاجِّ وَعِمَارَةَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ كَمَنْ آمَنَ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ} [التوبة: 19] “যারা হাজীদের পানি সরবরাহ করে এবং মসজিদুল হারামের রক্ষণাবেক্ষণ করে তোমরা কি তাদেরকে ওদের সমান করো, যারা আল্লাহ ও পরকালে ঈমান আনে ..." [তাওবাহ:১৯] আয়াতটি শেষ পর্যন্ত।
ইমাম মুসলিম এটি বর্ণনা করেছেননু‘মান ইবনু বাশীর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা উল্লেখ করেন, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মিম্বরের পাশে বসা ছিলেন, তখন এক ব্যক্তিকে বলতে শুনলেন: আমি মুসলিম হওয়ার পর কোনো আমল না করলেও কিছু আসে যায় না — যদি শুধু হজীদেরকে পানি পান করাতে পারি। আরেকজন বলল: আমি মুসলিম হওয়ার পর যদি কোনো আমল না-ও করি, তবুও কিছু যায় আসে না — যদি কেবল আমি মাসজিদুল হারামকে আবাদ করতে পারি। আরেকজন বলল: তোমরা যা বলেছো তার চেয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করা উত্তম। অতএব উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু তাদের নবীর মিম্বরের কাছে উচ্চস্বরে কথা বলা থেকে বিরত রাখলেন এবং এটি শুক্রবারের সকালের ঘটনা ছিল। তবে যখন জুম‘আর সালাত আদায় করব, তখন আমি ঢুকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তোমাদের মধ্যকার যে বিষয়ে মতানৈক্য ছিল তা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করব, তখন আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করলেন: তোমরা কি হাজীদের পানি পান করান ও মসজিদুল হারাম আবাদ করাকে ঐ ব্যক্তির মত বিবেচনা কর, যে আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান এনেছে এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে। তারা আল্লাহর কাছে বরাবর নয়। আর আল্লাহ যালিম কওমকে হিদায়াত দেন না। [আত-তাওবাহ:১৯]
আব্দুল্লাহ ইবনু মাস‘ঊদ রদিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে মারফূ সূত্রে বর্ণিত: তিনি আল্লাহ তা‘আলার বাণী: {وَمَنْ يُرِدْ فِيهِ بِإِلْحَادٍ بِظُلْمٍ نُذِقْهُ مِنْ عَذَابٍ أَلِيمٍ} {আর যে কেউ সেখানে অন্যায়ভাবে অন্যায় করার ইচ্ছা করে, তাকে আমরা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির স্বাদ আস্বাদন করাবো।} [আল-হাজ্জ: ২৫] সম্পর্কে বলেন: "যদি কোন মানুষ আদানের মত দূরত্বে থাকাকালীন সেখানে অন্যায় করার ইচ্ছা করে, তবে আল্লাহ তাকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির স্বাদ আস্বাদন করাবেন।"
এটি আহমাদ ও হাকিম বর্ণনা করেছেন।আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু আল্লাহ তা‘আলার বাণী {وَمَنْ يُرِدْ فِيهِ بِإِلْحَادٍ بِظُلْمٍ نُذِقْهُ مِنْ عَذَابٍ أَلِيمٍ} [الحج: 25] উল্লেখ করে বলেন: যদি কেউ মক্কার পবিত্র স্থানে এমন কিছু খারাপ কর্ম করার কথা ভাবে ও সংকল্প করে, যার মাধ্যমে সে পবিত্র স্থানে আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা লঙ্ঘন করবে, যেমন গালি দেওয়া বা ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করা, তাহলে তা হবে অন্যায় (জুলম)। যদি সংকল্পটি ইয়েমেনের আদেন শহরেও হয়, তাহলে সে যদি তা নাও করে থাকে, তবুও তার জন্য প্রাপ্য হল আল্লাহ তাকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দেবেন। এ ক্ষেত্রে দৃঢ় নিয়ত করাই যথেষ্ট।