





























Hadeeth Cards
Da'wa cards that highlight great meanings from the noble prophetic hadiths in a simple style and attractive display that helps the Muslim to have a deeper understanding of his religion in an easy way
All
‘আয়িশাহ রদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন: নবী সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিদিন রাতে যখন বিছানায় যেতেন, তখন তিনি তার দু হাতের তালু একত্রিত করে সূরা ইখ্লাস {قُلْ هُوَ اللهُ أَحَدٌ}, সূরা ফালাক {قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ الْفَلَقِ} ও সূরা নাস {قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ النَّاسِ} পাঠ করে তার মধ্যে ফুঁক দিয়ে যতদূর সম্ভব শরীরে হাত বুলাতেন। মাথা ও মুখ থেকে শুরু করে তার দেহের সম্মুখ ভাগের উপর হাত বুলাতেন এবং তিনি তিনবার এ রকম করতেন।
এটি বুখারী বর্ণনা করেছেন।নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অভ্যাস ছিল যে, তিনি যখন ঘুমানোর জন্য বিছানায় যেতেন, তখন তিনি তার দুই হাতের তালু একত্রিত করে উপরে উঠিয়ে -দু‘আকারী ব্যক্তি যেভাবে করে থাকে- তাতে অল্প করে ফুঁ দিতেন যাতে খুবই সামান্য কিছুটা থুথু থাকত, আর তিনটি সূরা পড়তেন: সূরা ইখ্লাস {قُلْ هُوَ اللهُ أَحَدٌ}, সূরা ফালাক {قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ الْفَلَقِ} ও সূরা নাস {قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ النَّاسِ}। তারপরে তিনি তার হাতের তালু দ্বারা শরীরে যতদূর সম্ভব হাত বোলাতেন, তার মাথা ও মুখমণ্ডল থেকে শুরু করতেন যাতে শরীরের সামনের অন্যান্য অংশও থাকত। এটা তিনি তিনবার করতেন।
‘আয়িশাহ রদিয়াল্লাহু ‘আনহা হতে বর্ণিত, তিনি বলেছেন: একবার আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ আয়াতটি তেলাওয়াত করলেন: {هُوَ الَّذِي أَنْزَلَ عَلَيْكَ الْكِتَابَ مِنْهُ آيَاتٌ مُحْكَمَاتٌ هُنَّ أُمُّ الْكِتَابِ وَأُخَرُ مُتَشَابِهَاتٌ فَأَمَّا الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ زَيْغٌ فَيَتَّبِعُونَ مَا تَشَابَهَ مِنْهُ ابْتِغَاءَ الْفِتْنَةِ وَابْتِغَاءَ تَأْوِيلِهِ، وَمَا يَعْلَمُ تَأْوِيلَهُ إِلَّا اللَّهُ، وَالرَّاسِخُونَ فِي الْعِلْمِ يَقُولُونَ آمَنَّا بِهِ كُلٌّ مِنْ عِنْدِ رَبِّنَا وَمَا يَذَّكَّرُ إِلَّا أُولُو الْأَلْبَابِ} যার অর্থ: “তিনিই আপনার প্রতি এই কিতাব নাযিল করেছেন যার কিছু আয়াত ‘মুহকাম’, এগুলো কিতাবের মূল আর অন্যগুলো ‘মুতাশাবিহ’, সুতরাং যাদের অন্তরে বক্রতা রয়েছে শুধু তারাই ফেৎনা এবং ভুল ব্যাখ্যার উদ্দেশ্যে মুতাশাবিহাতের অনুসরণ করে। অথচ আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কেউ এর ব্যাখ্যা জানে না। আর যারা জ্ঞানে সুগভীর, তারা বলে: আমরা এগুলোতে ঈমান রাখি, সবই আমাদের রবের কাছ থেকে এসেছে’; এবং জ্ঞান-বুদ্ধিসম্পন্ন লোকেরা ছাড়া আর কেউ উপদেশ গ্রহণ করে না।” [সূরা আলে-ইমরান: ০৭]। আয়িশাহ বলেছেন: তারপরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: “যখন তুমি কাউকে দেখবে সে এমন কিছুর অনুসরণ করছে, যার মধ্যে অস্পষ্টতা রয়েছে, তাহলে জেনে রাখবে, তারাই হচ্ছে ঐ সমস্ত লোক যাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেছেন- ‘তোমরা তাদের থেকে সতর্ক থাকবে।’”
সহীহ বুখারী ও মুসলিমরাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ আয়াত পাঠ করলেন, যার অর্থ: “তিনিই আপনার প্রতি এই কিতাব নাযিল করেছেন যার কিছু আয়াত ‘মুহকাম’, এগুলো কিতাবের মূল আর অন্যগুলো ‘মুতাশাবিহ’, সুতরাং যাদের অন্তরে বক্রতা রয়েছে শুধু তারাই ফেৎনা এবং ভুল ব্যাখ্যার উদ্দেশ্যে মুতাশাবিহাতের অনুসরণ করে। অথচ আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কেউ এর ব্যাখ্যা জানে না। আর যারা জ্ঞানে সুগভীর, তারা বলে: আমরা এগুলোতে ঈমান রাখি, সবই আমাদের রবের কাছ থেকে এসেছে’; এবং জ্ঞান-বুদ্ধিসম্পন্ন লোকেরা ছাড়া আর কেউ উপদেশ গ্রহণ করে না।” এ আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা সংবাদ দিয়েছেন যে, তিনিই তাঁর নবীর উপরে কুরআন নাযিল করেছেন। কুরআনে এমন কিছু আয়াত রয়েছে, যেগুলো স্পষ্ট অর্থ বহনকারী এবং দ্ব্যার্থহীন বিধান সম্বলিত, যার মধ্যে কোন ধরণের অস্পষ্টতা নেই। এগুলোই হচ্ছে কিতাব তথা কুরআনের মূল এবং প্রত্যাবর্তনস্থল। এটা পরষ্পর দ্বন্দের সময়ে প্রত্যাবর্তনস্থল। অন্যদিকে কুরআনে এমন কিছু আয়াতও রয়েছে, যেগুলো একাধিক অর্থের সম্ভাবনা রাখে, যেগুলোর অর্থ কতিপয় মানুষের নিকটে অস্পষ্টরূপে প্রতীয়মান হয় অথবা তারা মনে করে যে, এ আয়াতের সাথে অন্য আয়াতের বিরোধ রয়েছে। এরপরে আল্লাহ তা‘আলা এ ধরণের আয়াতগুলোর ব্যাপারে মানুষের আচরণ সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন। সুতরাং যাদের অন্তরে সত্য থেকে বিচ্যুত হওয়ার ব্যাপারটি থাকে, তারা মুহকাম (দ্ব্যর্থহীন) আয়াতগুলোকে পরিত্যাগ করে। আর তার বিপরীতে একাধিক অর্থের সম্ভাবনা রাখে এমন দ্ব্যর্থবোধক আয়াতগুলোকে গ্রহণ করে থাকে। এর দ্বারা তারা সন্দেহ ছড়ানো এবং মানুষকে পথভ্রষ্ট করার আকাঙ্খা পোষণ করে। এছাড়াও তারা তাদের প্রবৃত্তির অনুকুলে এর ব্যাখ্যা করার আশা করে। আর অপরপক্ষে জ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিগণ জানেন যে এটা মুতাশাবিহ (দ্ব্যর্থবোধক), তাই তারা এটাকে মুহকাম আয়াতের প্রতি ফিরিয়ে দেয়। আর উক্ত আয়াতগুলির উপরে ঈমান আনে যে, এগুলো আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার পক্ষ থেকেই, তাই সংশয় অথবা পারষ্পারিক বিরোধের কোন অবকাশই নেই। কিন্তু এ থেকে সুস্থ জ্ঞানের অধিকারী ছাড়া কেউই উপদেশ বা নসীহত গ্রহণ করতে পারে না। এরপরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মুল মুমিনীন ‘আয়িশাহ রদিয়াল্লাহু ‘আনহাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, তিনি যখন এমন কাউকে দেখবেন, যারা মুতাশাবিহ আয়াতকে অনুসরণ করে, তখন জেনে রাখবে, এরাই হচ্ছে ঐসব লোক যাদের ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন: “সুতরাং যাদের অন্তরে বক্রতা রয়েছে” তাদের থেকে সতর্ক থাকবে এবং তাদের প্রতি কর্ণপাত করবে না।
‘আয়িশাহ রদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন: এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে বসে বলল: ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমার কয়েকটি গোলাম রয়েছে। তারা আমাকে মিথ্যা বলে, আমার খিয়ানত করে এবং আমার অবাধ্য। আমি এদেরকে গাল-মন্দ ও মারধর করি। সুতরাং তাদের ব্যাপারে আমি কেমন? তিনি বললেন: “তোমার সাথে তারা যে খিয়ানত করেছে, অবাধ্য হয়েছে এবং মিথ্যা বলেছে আর তুমি এ সবের জন্য তাদের যে শাস্তি দিয়েছ তা হিসাব করা হবে। যদি তোমার শাস্তি অপরাধের সমান হয় তবে তা যথেষ্ট। এতে তোমার লাভ বা ক্ষতি কোনটিই হবে না। আর শাস্তি যদি এদের অপরাধের চেয়ে কম হয়, তবে তা তোমার অতিরিক্ত মর্যাদা। আর তোমার শাস্তি যদি অপরাধের চেয়ে বেশি হয়, তবে অতিরিক্তটির পরিমাণে তাদের পক্ষে প্রতিশোধ গ্রহণ করা হবে।” রাবী বলেন: লোকটি একপাশে সরে গিয়ে সজোরে কাঁদতে লাগল। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: “তুমি কি আল্লাহর কিতাব পাঠ কর না: ونَضَعُ الْمَوَازِينَ الْقِسْطَ لِيَوْمِ الْقِيَامَةِ فَلاَ تُظْلَمُ نَفْسٌ شَيْئًا وَإِنْ كَانَ مِثْقَالَ যার অর্থ: “এবং কিয়ামত দিবসে আমি স্থাপন করব মানদন্ড, সুতরাং কারো প্রতি কোন অবিচার করা হবে না, যদি তা বিন্দুমাত্রও হয়ে থাকে।” লোকটি বলল: ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আল্লাহর কসম! আমার এবং তাদের মধ্যে পৃথক করা ছাড়া উত্তম অন্য কিছু মনে হচ্ছে না। আপনাকে সাক্ষী রেখে বলছি: এরা সবাই মুক্ত।
এটি তিরমিযী বর্ণনা করেছেন।নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে একজন লোক তার গোলামদের ব্যাপারে অভিযোগ করতে এসে জানালেন, তারা তাকে মিথ্যা সংবাদ দেয়, আমানতের খিয়ানত করে, আচরণে ধোঁকা দেয় এবং কাজে অবাধ্য হয়। তাদেরকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য সে তাদেরকে গাল-মন্দ এবং প্রহার করে। তাদের ব্যাপারে কিয়ামাতের দিনে তার অবস্থা কেমন হবে, এটা জিজ্ঞাসা করল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন: তোমাকে তারা যে মিথ্যা বলেছে, খিয়ানত করেছে এবং তোমার অবাধ্য হয়েছে, সেগুলোকে হিসাব করা হবে, আবার তাদেরকে তোমার দেওয়া শাস্তিও হিসাব করা হবে, যদি তাদের অপরাধ তোমার দেওয়া শাস্তির সমান হয়, তাহলে তোমার কোন লাভ অথবা ক্ষতি কোনটিই হবে না। আর যদি তোমার দেওয়া শাস্তি তাদের অপরাধের চেয়ে কম হয়, তাহলে সেটা তোমার পুরষ্কার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বাড়তি মর্যাদা হিসেবে গণ্য হবে। পক্ষান্তরে যদি তোমার দেওয়া শাস্তি তাদের অপরাধের চেয়ে বেশী হয়, তাহলে তোমাকে শাস্তি দেওয়া হবে। ফলে তোমার থেকে বাড়তি পরিমাণ গ্রহণ করা হবে এবং তাদেরকে প্রদান করা হবে। এ কথা শুনে লোকটি একদিকে সরে যেয়ে জোরে কাঁদতে লাগল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: তুমি কি আল্লাহর কিতাবে পড় না যে, তিনি বলেছেন: যার অর্থ: “আর কিয়ামাতের দিনে আমরা স্থাপন করব মানদন্ড, সুতরাং কারো প্রতি কোন যুলুম করা হবে না এবং আমল যদি শষ্য দানা পরিমাণ ওজনেরও হয়, তবুও তা আমরা উপস্থিত করব; আর হিসেব গ্রহণকারীরূপে আমরাই যথেষ্ট।” [সূরা আল-আম্বিয়া: ৪৭], সুতরাং কোন ব্যক্তির উপরেই কিয়ামাতের দিন কোন যুলুম করা হবে না। আর মানুষের মাঝে ন্যায় সহকারে মানদন্ডকে উপস্থিত করা হবে। তখন লোকটি বলল: আল্লাহর কসম! হে আল্লাহর রাসূল! তাদেরকে ছেড়ে দেওয়া এবং মুক্ত করে দেওয়া থেকে তাদের এবং আমার জন্য উত্তম কোন পথ দেখছি না। আমি আপনাকে সাক্ষী রেখে বলছি: আল্লাহর উদ্দেশ্যেই তারা সকলেই মুক্ত। তিনি এ কথা বলেছিলেন হিসাব ও আযাবের ভয়ে।
ইবনু ’আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা হতে বর্ণিত, কিছু মুশরিক লাক বহু হত্যা করে এবং বেশি বেশি ব্যভিচার করে। তারপর তারা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বলল, আপনি যা বলেন এবং যেদিকে আহবান করেন, তা অতি উত্তম। আমাদের যদি অবগত করতেন, আমরা যা করেছি, তার কাফ্ফারা কী? এ প্রেক্ষাপটে অবতীর্ণ হয়: (অর্থ) “এবং যারা আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোন মাবূদ কে ডাকে না, আল্লাহ্ যাকে হত্যা করা নিষেধ করেছেন, তাকে না-হক হত্যা করে না এবং ব্যভিচার করে না”। [ফুরকান:৬৮] আরো অবতীর্ণ হয়ঃ ’’হে আমার বান্দাগণ! তোমরা যারা নিজেদের প্রতি অন্যায় করে ফেলেছ, আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে নিরাশ হয়ো না।’’ [যুমার:৫৩]
সহীহ বুখারী ও মুসলিমমুশরিকদের কিছু লোক নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আসল, তারা ইতোপূর্বে বহু হত্যা এবং অনেক ব্যভিচার করেছে। তারা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলল: ইসলাম ও তার শিক্ষার দিকে আপনার আহ্বান খুবই ভালো, কিন্তু আমাদের অবস্থা কী এবং আমরা যে শিরক ও কবিরাহ গুনাহে লিপ্ত হয়েছি; তার কোনো কাফফারা আছে কী? তখন আয়াত দু’টি নাযিল হলো, যেখানে আল্লাহ তাদের অধিক গুনাহ ও মহা পাপে পতিত হওয়া সত্তেও তাদের তাওবা কবুল করেছেন, যদি এরূপ না হতো, তাহলে তারা তাদের কুফরীতে ও সীমালঙ্ঘনে অব্যাহত থাকত এবং কখনো এই দীনে প্রবেশ করত না।
ইবনু উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত, মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপস্থিত জনতার উদ্দেশে ভাষণ দেন এবং বলেনঃ “হে জনমণ্ডলী! তোমাদের হতে আল্লাহ তা’আলা জাহিলিয়াত যুগের দম্ভ ও অহংকার এবং পূর্বপুরুষের অহংকার বাতিল করেছেন। এখন মানুষ দুই অংশে বিভক্তঃ এক দল মানুষ নেককার, পরহেজগার, আল্লাহ তা’আলার নিকট প্রিয় ও সম্মানিত এবং অন্য দল পাপিষ্ঠ, দুর্ভাগা, আল্লাহ তা’আলার নিকট অত্যন্ত নিকৃষ্ট, নিচু ও ঘৃণিত। সকল মানুষই আদম সন্তান। আল্লাহ তা’আলা আদম-কে মাটি দিয়ে তৈরী করেছেন। মহান আল্লাহ তা’আলা বলেছেনঃ “হে লোক সকল! তোমাদেরকে আমি একজন পুরুষ ও একজন নারী হতে তৈরী করেছি, তারপর বিভিন্ন বংশ ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, তোমরা যাতে একে অন্যকে চিনতে পার। যে লোক বেশি পরহেজগার সেই আল্লাহ তা’আলার নিকট বেশী মর্যাদার অধিকারী। আল্লাহ তা’আলা সবকিছু সম্পর্কে জ্ঞাত, সব খবর রাখেন। [হুজুরাত ১৩]”।
এটি তিরমিযী ও ইবনে হিব্বান বর্ণনা করেছেন।নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা বিজয়ের দিন ভাষণ দানকালে বলেন, হে লোকসকল, নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের থেকে জাহিলি যুগের অহঙ্কার, বড়ত্ব ও বাপ-দাদাদের নিয়ে গর্ব করাকে রহিত করেছেন। এখন মানুষেরা দু’ভাগে বিভক্ত: প্রথমঃ হয়তো মুমিন নেককার মুত্তাকি আল্লাহর আনুগত্য পরায়ন অনুগত ইবাদতকারী, সে আল্লাহর নিকট সম্মানিত, যদিও সে মানুষের নিকট সম্মানিত নয় অথবা বড় বংশীয় নয়। দ্বিতীয়ঃ কাফির পাপী হতভাগা, সে আল্লাহর নিকট লাঞ্ছিত অপমানিত, সে কোনো কিছুর সমান নয়, যদিও মানুষের নিকট সম্মানিত, মর্যাদা ও ক্ষমতার অধিকারী। মানুষ সবাই আদম সন্তান। আল্লাহ আদমকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন। কাজেই যার উৎস হলো মাটি তার পক্ষে অহংকার করা ও আত্মতষ্টিতে ভোগা উচিত নয়। এর নমুনা হলো আল্লাহ তা‘আলার বাণী: {يا أيها الناس إنا خلقناكم من ذكر وأنثى وجعلناكم شعوبا وقبائل لتعارفوا إن أكرمكم عند الله أتقاكم إن الله عليم خبير} [الحجرات: 13]. “হে লোক সকল! তোমাদেরকে আমি একজন পুরুষ ও একজন নারী হতে তৈরী করেছি, তারপর বিভিন্ন বংশ ও গোত্রে তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি, তোমরা যাতে একে অন্যকে চিনতে পার। যে লোক তোমাদের মাঝে বেশি পরহেজগার সেই আল্লাহ তা’আলার নিকট বেশী মর্যাদার অধিকারী। আল্লাহ তা’আলা সবকিছু সম্পর্কে জ্ঞাত, সব খবর রাখেন। [সূরা হুজুরাত: আয়াত ১৩]”।
যুবাইর বিন আওওয়াম হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন অবতীর্ণ হলঃ {ثُمَّ لَتُسْأَلُنَّ يَوْمَئِذٍ عَنِ النَّعِيمِ} [التكاثر: 8] “তারপর তোমাদেরকে সেদিন অবশ্যই নি’আমাত সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে”— (সূরা তাকাসুর, আয়াত: ৮)। যুবাইর বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদেরকে কোন নি’আমাত সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে? আমাদের নিকট তো শুধুমাত্র দু’ধরনের জিনিস রয়েছে? খেজুর ও পানি? তিনি বললেনঃ “ জেনে রাখো ! এরই হিসাব হবে”।
এটি তিরমিযী ও ইবনে মাজাহ বর্ণনা করেছেন।যখন আয়াতটি নাযিল হলো: (তারপর তোমাদেরকে সেদিন অবশ্যই নি’আমাত সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে), অর্থাৎ আল্লাহ তোমাদের ওপর যেসব নিয়ামত দান করেছেন তার শোকর আঞ্জাম দেওয়ার ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে। জুবাইর ইবনুল আওওয়াম রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, হে আল্লাহর রাসূল, কোন নিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবো?! নিয়ামত তো কেবল দু’টি: খেজুর ও পানি, যার সম্পর্কে জবাবদিহি করার তেমন কিছু নেই! নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, জেনো রেখো, তোমরা বর্তমান যেই অবস্থায় রয়েছে তার ওপরই নিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। কারণ, এ দু’টি আল্লাহ তা‘আলার মহান ও বড় নিয়ামত।
আব্দুল্লাহ ইবনু মাস‘ঊদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: একদিন নবী সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, “তুমি কুরআন পাঠ কর”। আমি আরয করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আপনার কাছে কুরআন পাঠ করব? অথচ তা তো আপনার ওপরই অবতীর্ণ হয়েছে। তিনি বললেন, “হ্যাঁ”। এরপর আমি ’সূরাহ নিসা’ পাঠ করলাম। যখন আমি এই আয়াত পর্যন্ত আসলাম {فَكَيْفَ إِذَا جِئْنَا مِنْ كُلِّ أُمَّةٍ بِشَهِيدٍ، وَجِئْنَا بِكَ عَلَى هَؤُلاَءِ شَهِيدًا} [চিন্তা করো আমি যখন প্রত্যেক উম্মাতের মধ্য থেকে একজন করে সাক্ষী উপস্থিত করব এবং সকলের ওপরে তোমাকে সাক্ষী হিসাবে হাযির করব তখন তারা কী করবে। নিসা:৪১] নবী সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “আপাততঃ যথেষ্ট হয়েছে”। আমি তাঁর চেহারার দিকে তাকালাম, দেখলাম, তাঁর চোখ থেকে অশ্রু ঝরছে।
সহীহ বুখারী ও মুসলিমনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে বললেন, “আমার কাছে কুরআনের কিছু পাঠ করো।” তিনি বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আমি কীভাবে আপনার কাছে কুরআন তিলাওয়াত করব, যখন এটি তো আপনার ওপরই অবতীর্ণ হয়েছে?!” নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “আমি চাই, অন্যের মুখ থেকে তা শুনতে।” তখন তিনি সূরাতুন নিসা থেকে তিলাওয়াত করতে লাগলেন। যখন এই আয়াতে পৌঁছালেন: {فَكَيْفَ إِذَا جِئْنَا مِنْ كُلِّ أُمَّةٍ بِشَهِيدٍ، وَجِئْنَا بِكَ عَلَى هَؤُلاءِ شَهِيدًا} [তখন অবস্থা কী হবে, যখন আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্যে একজন সাক্ষী আনব, আর আপনাকে (হে নবী) এই সকলের বিরুদ্ধে সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত করব?] অর্থাৎ যখন তোমাকে (হে নবী) তোমার উম্মতের বিরুদ্ধে সাক্ষী করে উপস্থিত করা হবে যে, তুমি তোমার রবের বার্তা তাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছো, তখন তোমার এবং তোমার উম্মতের অবস্থা কী হবে? এই আয়াত শুনে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: এখন তিলাওয়াত বন্ধ করো। ইবনু মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন: আমি তাঁর দিকে ফিরে তাকালাম, তখন দেখি তাঁর চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে, সেই ভয়াবহ দৃশ্যের ভয়ে আর তাঁর উম্মতের প্রতি দয়ায়।
ইবনে মাসঊদ রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে মারফূ হিসেবে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘কেবল দু’জন ব্যক্তি ঈর্ষার পাত্র। সেই ব্যক্তি যাকে আল্লাহ ধন-সম্পদ দান করেছেন এবং তাকে তা সৎপথে ব্যয় করার শক্তিও দিয়েছেন। আর সেই লোক যাকে আল্লাহ জ্ঞান-বুদ্ধি দান করেছেন, যার বদৌলতে সে বিচার-ফায়সালা করে থাকে ও তা অপরকে শিক্ষা দেয়।’’ আব্দুল্লাহ ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুমা কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘দু’জনের ক্ষেত্রে ঈর্ষা করা সিদ্ধ। [১] যাকে আল্লাহ কুরআন [মুখস্থ করার শক্তি] দান করেছেন, সুতরাং সে ওর [আলোকে] দিবা-রাত্রি পড়ে ও আমল করে। [২] যাকে আল্লাহ তা'আলা ধন-সম্পদ দান করেছেন এবং সে [আল্লাহর পথে] দিন-রাত ব্যয় করে।’’
উভয় বর্ণনা মুত্তাফাকুন আলাইহি (বুখারী ও মুসলিম)।এখানে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইঙ্গিত করেছেন যে, হিংসা বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। তার মধ্যে এক প্রকার হিংসা নিন্দনীয় এবং শরীয়তে নিষিদ্ধ। আর তা হচ্ছে, কোনো মানুষ তার ভাইয়ের নেয়ামতের ধ্বংস কামনা করা। আরেক প্রকার হিংসা হচ্ছে মুবাহ।অন্যের পার্থিব নেয়ামত দেখে নিজের জন্য অনুরূপ নেয়ামতের আশা করা প্রশংসীয় হিংসা। শরীয়তের দৃষ্টিতে এটি মুস্তাহাব। আর এটিই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর এ বাণী দ্বারা বুঝিয়েছেন, “একমাত্র দু’টি বিষয়েই হিংসা করা যায়।” অর্থাৎ হিংসার প্রকারের ভিন্নতা অনুযায়ী তার আহকামও বিভিন্ন ধরণের হয়ে থাকে। দু’টি ক্ষেত্র ব্যতীত শরীয়তে তা প্রশংসনীয় ও মুস্তাহাব হতে পারে না। প্রথমটি হলো, এমন ধনী ও তাকওয়াবান ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ তাআলা হালাল সম্পদ দিয়েছেন। অতঃপর সে তা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করে। সুতরাং তার মতো হওয়া এবং তাকে এই নেয়ামতের জন্য হিংসা করা বৈধ। দ্বিতীয়টি হলো, এমন আলেম যাকে আল্লাহ তাআলা উপকারী জ্ঞান দিয়েছেন। সে ইলম অনুযায়ী আমল করে, তা অন্যকে শিক্ষা দেয় এবং এর মাধ্যমে মানুষের মাঝে বিচার ফয়সালা করে। অনুরূপ ব্যক্তি হওয়ার আশা করা মুস্তাহাব।
‘আবদুর রাহমান ইবন ইয়াযীদ আন-নাখ‘ঈ থেকে বর্ণিত, তিনি ইবন মাস‘ঊদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর সঙ্গে হজ আদায় করলেন। তিনি তাকে দেখলেন বাইতুল্লাহকে নিজের বামে রেখে এবং মিনাকে ডানে রেখে বড় জামরাকে সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করলেন। এরপর বললেন, এটিই ঐ সত্ত্বার দাঁড়ানোর স্থান, যার উপর সূরা বাকারাহ নাযিল হয়েছে।
মুত্তাফাকুন ‘আলাইহি (বুখারী ও মুসলিম)।কুরবানীর দিন ও তাশরীকের দিনসমূহে পাথর নিক্ষেপ করা একটি মহান ইবাদাত; তাতে রয়েছে আল্লাহর জন্য বিনয় হওয়া, তার আদেশ পালন করা এবং ইবরাহীম আলাইহিস সালামের অনুকরণ করা। কুরবানীর দিন হাজীগণ যে আমলটি প্রথম করে সেটি হচ্ছে বড় জামরায় পাথর মারা, যেন এটিই সকল আমলের ভূমিকাস্বরূপ হয়। সুতরাং জামরায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দাঁড়ানোর স্থানে দাঁড়াবে। পবিত্র কা‘বাকে ডানে এবং মিনাকে বামে রেখে কিবলামুখী হয়ে দাঁড়িয়ে সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করবে। আর প্রতিটি কঙ্কর নিক্ষেপের সাথে তাকবীর বলবে। যেমন, এভাবেই দাঁড়িয়েছিল ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু। আর তিনি শপথ করে বলেন যে, এটিই ছিল সে মহান ব্যক্তির দাঁড়ানোর স্থান, যার উপর সূরা বাকারাহ অবতীর্ণ হয়েছে।